বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় ফুলের গুনাগুন

0
80
OLYMPUS DIGITAL CAMERA

সর্পগন্ধা

সর্পগন্ধা ঔষধি গুনের জন্য বিখ্যাত। এর অন্য নাম চন্দ্রা। আমাদের দেশের সব জায়গায় এটি দেখা যায় না। খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশ, তামাবিলের জঙ্গল এবং রাঙামাটি বান্দরবান এলাকায় কিছু কিছু দেখা যায়। এর আরও কিছু নাম আছে-নাকুলি, সুগন্ধা, রক্তপত্রিকা, ঈশ্বরী, অহিভুক, সর্পদনী। রাজনিঘণ্টুতে আছে-নাকুলী তিক্ত ও কটুরস, ত্রিদোষনাশক ও নানা প্রকার বিষদোষনাশক।

এর শিকড়ের রস রক্তচাপ কমাতে বেশ কার্যকর। মূলের রস মস্তিস্কজনিত রোগে উপকারী। সেজন্য একে পাগলের ওষুধ বলা হয়। সাপের বিষ এবং পোকা-মাকড়ের দংশনে এর রস বিশেষ ফলদায়ক। এর রসে আছে অ্যালকালয়েডস, যা রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।

নললতা

বৈজ্ঞানিক নামঃ Thunbergia gradiflora
শহুরে বনেদি বাড়িতে কদাচিৎ এই ফুলটি দেখতে পাওয়া যায়। লতানো গাছ আর হালকা বেগুনি বা সাদা ফুলগুলো সব ঝুলে থাকে। পাতা বেশ কর্কশ, কণ্টকময় এবং শক্ত কাণ্ড। ফুল গন্ধযুক্ত এবং কীটপতঙ্গের মধু যোগানদাতা। এর বনজ প্রজাতির দেখা মিলবে রাঙামাটি সহ পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন পাহাড়ের কোলে। বাংলা নাম নললতা। বাগানের প্রজাতির চেয়ে বনজ প্রজাতির ফুল বেশ বড় এবং সংখ্যায় কম ফোটে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার প্রায় সবখানে এই ফুল দেখা যায়।
এর শিকড়ে আছে প্রচুর পরিমানে ট্যানিন যা সর্পদংশনে উপকারী। এছাড়া এর রস পাকস্থলীর রোগে ব্যবহৃত হয়।

ধুতুরা

প্রাচীন ব্যবিলনীয় সভ্যতার এক মৃৎ পাত্রে ধুতুরা ফুলের নিদর্শন পাওয়া যায়। চীনের সম্রাট সেন নুং চার হাজার বছর আগেই ধুতুরার গুনাগুন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। আমাদের দেশের সব জায়গাতেই পাওয়া যায় এই গাছ। নানা ধরনের গুনাগুণের জন্য এঁর বেশ কয়েকটি নাম রয়েছে, যেমন- ধুস্তর, কিতব, মাতুলক, মদন, শিবশেখর, কণ্টফল, মোহন, কলভোন্মত্ত, শৈব ইত্যাদি।  ধুতুরার গাছে আছে ট্রোপেন অ্যাকোলয়েডস। বীজে আছে ডাটুরানোলোন। এসব উপাদান থাকার ফলে এই ফুল বিষাক্ত, অধিক সেবনে মস্তিষ্কের বিকৃতি এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

পরিমিত ব্যবহারে এই উদ্ভিদ বিভিন্ন মানসিক ও স্নায়ুবিক রোগে উপকারী। এছাড়া বাত, চর্ম রোগ এসবেও ধুতুরা কার্যকরী ফল দেয়।

দাঁতরাঙা

ফুলের নাম দাঁতরাঙা। বৈজ্ঞানিক নাম Melastoma malabathricum. এঁকে আমাদের দেশে বন তেজপাতা, লুটকি এসব নামেও ডাকা হয়। এঁরা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। বিশেষ করে মালয় এবং ইন্দোনেশিয়ার বন-জঙ্গলে। আমাদের দেশে বেশ কয়েকটি জাত দেখা যায়। বিশেষ করে পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড়ের ধারে প্রচুর দেখা যায়। পাতা দেখতে অনেকটা তেজপাতার মত সরু ও লম্বা। পাঁচটি পাপড়িতে আবৃত ফুলটির রঙ গোলাপি থেকে হালকা লাল। পাতা ও ফুলের রঙ লালচে বলেই এঁর নাম সম্ভবত দাঁতরাঙা। এঁর পাতার রস আমাশয় ও পেটের অসুখে উপকারী।

শেয়ালকাঁটা

 

শেয়ালকাঁটার দেখা মিলবে আমাদের গ্রামের আশেপাশের ঝোপঝাড়,খেত খামারের পাশে, পুরনো ভবনে পাশে। এসব এলাকায় শেয়ালের আবাস বলে গ্রামের মানুষ এঁকে শেয়ালকাঁটা নাম দিয়েছে। বন ও পাহাড়ি এলাকা ছাড়াও শেয়ালকাঁটা দেশের অসংখ্য জলাশয়, হাওর-বিল, পানা পুকুর থেকে শুরু করে সুন্দরবন ঘেঁষে সমুদ্রোপকূলের বিশাল এলাকায় চোখে পড়বে। পাতা বেশ ধারালো এবং তিখন কাঁটায় পরিপূর্ণ। দেখতে অনেকটা আফিম গাছের মত। আফিম এবং শেয়ালকাঁটা একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। বৈজ্ঞানিক নাম Argemone Mexicana. আমাদের দেশে এসেছে সুদূর মেক্সিকো থেকে। ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ বাণিজ্যিক জাহাজে আলুর বস্তা এবং মাটির সঙ্গে সরিষার দানার মত ছোট ছোট বীজ আমাদের দেশে চলে এসেছিল। এরপর ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। ভেষজ পণ্ডিতরা এঁকে অনেক নামে অলংকৃত করেছেন। যেমন- স্বর্ণক্ষীরা, স্বর্ণদুগ্ধা, রুক্সিনী, সুবর্ণা, হেমদুগ্ধী ও কাঞ্চনী। শেয়ালকাঁটার রস কুষ্ঠ রোগে ব্যবহৃত হয়। গাছের পীতবর্ণের রস গনোরিয়া ও উপদংশ রোগে উপকারী।

রক্তজবা

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae
(অবিন্যাসিত): Angiosperms
(অবিন্যাসিত): Eudicots
(অবিন্যাসিত): Rosids
বর্গ: Malvales
পরিবার: Malvaceae
গণ: Hibiscus
প্রজাতি: H. rosa-sinensis
বৈজ্ঞানিক নাম: Hibiscus rosa-sinensis.
আমাদের দেশের অনেকেই বাড়ির আঙিনা কিংবা বাসাবাড়ির ছাদের টবে নানা জাতের ফুলগাছ লাগিয়ে থাকে। এসব গাছের মধ্যে জবা একটি। দেশের সর্বত্রই এই ফুলের চাষ হয়। এই ফুলের বাংলা নামরক্তজবা, জবা, জবা কুসুম। অন্যান্য স্থানীয় নামের মধ্যে China Rose, Chinese hibiscus উল্লেখযোগ্য। চিন দেশ এর উত প ত্তিস্থান। গাছ টি ২-৪ মি. উঁচু, কাণ্ড খস খ সে, পাতা মসৃণ ও চকচকে, ফুল ১০-১৫ সে. মি. চওড়া। ফুল এক ক অথবা দ্বৈত। গাছটি কষ্টসহিষ্ণু, অল্প যত্নে জন্মে। শাখা কলম দ্বারা এর বংশ বিস্তার হয়। প্রায় সারা বছরই গাছে ফুল ফোটে। বর্তমানে অনেক ধরনের হাইব্রীড জবার অস্তিত্ব পাওয়া যায় এবং সেগুলোর মধ্যে বর্ণবৈচিত্র প্রচুর। দেখতে সুদৃশ্য হওয়াতে এদেরকে আমরা সাধারণত বাগানে শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসাবে লালন করে থাকি।
জবা ফুল দেখতে খুব সুন্দর হলেও এর ঔষধি গুণ কিন্তু কম নয়। চোখ উঠলে, মাথায় টাক পড়লে কিংবা হাতের তালু থেকে চামড়া ওঠা শুরু হলে জবা ফুল বেটে রস লাগালে দ্রুত নিরাময় হয়। ডায়াবেটিসের রোগী নন, অথচ প্রচুর পরিমাণে পানি পান করার পরপরই ঘন ঘন যাদের মূত্র ত্যাগ করতে হয়, তারা জবা গাছের ছালের রস পানিসহ নিয়মিত কয়েকদিন এক চা চামচ পরিমাণ করে খেলে উপকার পাবেন।
উল্লেখ্য ঝুমকো জবা, লংকা জবাসহ জবার আরো বেশ কিছু প্রজাতি বাংলাদেশে যথেষ্ট জনপ্রিয়।

চালতা

চালতা এক রকমের ফল । এই ফল দিয়ে চাটনিআচার তৈরি হয় । বাংলাদেশে এটি স্থানবিশেষে চালিতা, চাইলতে  ইত্যাদি নামেও অভিহিত। চালতার বৈজ্ঞানিক নাম Dillenia indica। এর জন্ম ভারতবর্ষে। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র চালতা গাছ জন্মে। গাছটি দেখতে সুন্দর বলে শোভাবর্ধক তরু হিসাবেও কখনো কখনো উদ্যানে লাগানো হয়ে থাকে। ঢাকার বলধা গার্ডেনের পুকুর ঘাটে লাগানো গাছটিও শোভা বর্ধনের উদ্দেশ্যেই লাগানো হয়েছিল। চালতা এদেশে একটি অনাদৃত ফল। ফলটি দেখতেও আকর্ষণীয় নয়। এর চাষ হয় না। ফল টক বলে চালতার আচার, চাটনি, টক ডাল অনেকের প্রিয় খাদ্য। পাকা ফল পিষে নিয়ে নুন-লংকা দিয়ে মাখালে তা বেশ লোভনীয় হয়। গ্রাম এলাকায় সাধারণত জঙ্গলে এ গাছ জন্মে ; কখনো কখনো দু’একটি গাছ বাড়ির উঠানে দেখা যায়। চালতা গাছ মাঝির আকারের চিরহরিৎ বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। এ গাছ উচ্চতায় ১৫ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। গাছের গায়ে লালচে রঙের চকচকে বাকল থাকে। পাতার কিনারা খাঁজ কাটা, শিরা উঁচু সমান্তরাল। চালতার সাদা রঙের ফুল দেখতে সুন্দর ; এটি সুগন্ধযুক্ত। ফুলের ব্যাস ১৫-১৮ সেন্টিমিটার। ফুলে পাঁচটি মোটা পাঁপড়ি থাকে ; বৃতিগুলো সেসব পাঁপড়িকে আঁকড়ে ঘিরে রাখে। বছরের মে-জুন মাসে ফুল ফোটার মৌসুম। চালতা ফলের যে অংশ খাওয়া হয় তা আসলে ফুলের বৃতি। প্রকৃত ফল বৃতির আড়ালে লুকিয়ে থাকে। ফল বাঁকানো নলের মত ; ভিতরে চটচটে আঠার মধ্যে বীজ প্রোথিত থাকে। চালতার ফল খাওয়া হয় না ; মাংসল বৃতিই ভক্ষণযোগ্য। বর্ষার পর ফল পাকে, শীতকাল পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। পাকা ফলের বীজ থেকে চারা তৈরি করা যায়। গাছে ফল পাকলে যদি তা না পাড়া হয় তবে সে ফল থেকে বীজ আপনাআপনি মাটিতে ঝরে পড়ে ; অনুকূল পরিবেশে তা থেকে চারা গজায়। এজন্য চালতা তলায় প্রায়শ: ছোট ছোট অনেক চারা দেখা যায়। এসব চার তুলে বাগানে লাগিয়ে দিলেও গাছ হয়।

মেহেদি

মেহেদি গাছ আমাদের অত্যন্ত পরিচিত একটি উদ্ভিদ। এটি মাঝারি আকারের গুল্ম জাতিয় গাছ। ফলের রং সাদা। আকার ছোট এবং গোলাকৃতি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটি ‘হেনা’ নামে পরিচিত। মেহেদি রঞ্জক উদ্ভিদ। ধর্মীয় কিংবা সামাজিক উৎসব-অনুষ্ঠানে মেহেদির পাতার ব্যবহার বহুল প্রচলিত। এছাড়া মেহেদি ফুল থেকে সুগন্ধি তৈরি করা হয়। রক্তক্ষরণ এবং নানাবিধ চর্মরোগ নিরাময়ে মেহেদি গাছের ছাল ও বিচি ভেষজ ওষুধ হিসেবে বহুকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
রোদ বা গরমের কারণে মাথাব্যথা হলে মেহেদির ফুল বেটে সিরকার সঙ্গে মিশিয়ে কপালে প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়।

তিতবেগুন

তিত বেগুন
বৈজ্ঞানিক নাম: Solarium capsicoides
সমনামঃ Solanum aculeatissimum sensu Schulz non Jacq. Solanum ciliatum Lam. Solanum spinosissimumauct.
বাংলা নামঃ তিত বেগুন।
ইংরেজি নামঃ Cockroach berry
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্যঃ Plantae – Plants
উপরাজ্যঃ Tracheobionta – Vascular plants
অধিবিভাগঃ Spermatophyta – Seed plants
বিভাগঃ Magnoliophyta – Flowering plants
শ্রেণীঃ Magnoliopsida – Dicotyledons
উপশ্রেণিঃ Asteridae
বর্গঃ Solanales
পরিবারঃ Solanaceae – Potato family
গণঃ Solanum L. – nightshade.
প্রজাতিঃSolanum capsicoides All. – cockroach berry.
পরিচিতিঃ  প্রচুর কাঁটাযুক্ত বেগুন জাতীয় গুল্ম। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র দেখা যায়। রাস্তা, রেল লাইনের পাশে, গ্রামীণ মেঠো পথের ধারে এই উদ্ভিদ প্রচুর পরিমানে দেখা যায়। এই গাছের ফল বিভিন্ন রোগের ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

তেলাকুচা

তেলাকুচা
বৈজ্ঞানিক নামঃ Coccinia grandis
সমনামঃ Bryonia grandis L.
Coccinia cordifolia auct. non (L.) Cogn.
Coccinia indica Wight & Arn.
Cephalandra indica Naud.
বাংলা নামঃ তেলাকুচা কাকিঝিঙ্গা, কাওয়ালুলি, কান্দুরি, কুচিলা, মাকাল।
ইংরেজি নামঃ lvy Gourd.
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্যঃ Plantae – Plants
উপরাজ্যঃ Tracheobionta – Vascular plants
অধিবিভাগঃ Spermatophyta – Seed plants
বিভাগঃ Magnoliophyta – Flowering plants
শ্রেণীঃ Magnoliopsida – Dicotyledons
উপশ্রেণিঃ Dilleniidae
বর্গঃ Violales
পরিবারঃ Cucurbitaceae – Cucumber family
গণঃ CocciniaWight & Arn. – coccinia
প্রজাতিঃCoccinia grandis (L.) Voigt- ivy gourd.
তেলাকুচা একজাতীয় ভেষজ উদ্ভিদ। এর বোটানিক্যাল নাম Coccinia Cordifolia Cogn। এটি Cucurbitaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং ভেষজ নাম: Cocciniaবাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে একে তেলা, তেলাকচু, তেলাহচি, তেলাচোরা কেলাকচু, তেলাকুচা বিম্বী এসব নামে ডাকা হয়। গাছটির প্রায় প্রতিটি অংশই ভেষজ ব্যবহারের জন্য ব্যবহৃত হয়।
এটি একটি লতা জাতীয় উদ্ভিদ।গাঢ় সবুজ রঙের পাতা এবং কাণ্ড এই উদ্ভিদটি আমাদের দেশের প্রায় সব স্থানে দেখতে পাওয়া যায়। বন্য লতা। কাণ্ড নরম ও দূর্বল।  পঞ্চভূজ আকৃতির পাতা , পাতা ও লতার রং সবুজ।
বসতবাড়ির আশেপাশে, রাস্তার পাশে, গ্রামীণ ঝোপ-ঝাড়ে তেলাকুচা জন্মায় এবং বংশবিস্তার করে। লতাটি মরে গেলেও পুরাতন মূল শুকিয়ে যায় না। বর্ষায় নতুন করে পাতা গজায় এবং কয়েক বছর ধরে পুরানো মূল থেকে গাছ হয়ে থাকে। শীতকালছাড়া সব মৌসুমেই তেলাকুচার ফুল ও ফল হয়ে থাকে। ফল ধরার ৪ মাস পর পাকে এবং পাকলে টকটকে লাল হয়।
ডায়াবেটিক রোগে তেলাকুচার কান্ডসহ পাতার রস বানিয়ে আধাকাপ করে সকাল ও বিকালে খেলে উপকার পাওয়া যায়। জন্ডিস হলে তেলাকুচার মূল ছেঁচে রস বানিয়ে প্রতিদিন সকালে আধাকাপ পরিমাণ খেলে উপকার হয়। পায়ে পানি জমে পা ফুলে গেলে তেলাকুচার মূল ও পাতা ছেঁচে এর রস ৩-৪ চা-চামচ প্রতিদিন সকালে ও বিকালে খেলে উপকার পাওয়া যায়।

জারুল ফুল

জারুল বাংলাদেশের নিম্নভূমির একান্ত অন্তরঙ্গ তরুদের অন্যতম। লেজারস্ট্রমিয়া গণের এই উদ্ভিদ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রজাতি। এটি মধমাকৃতির পত্রমোচী বৃক্ষ। ম্লানধূসর মসৃণ কান্ডবিশিষ্ট জারুল ২০ মি পর্যন্ত উচুঁ হতে পারে। এর পত্র বৃহৎ, ৬-৮ ইঞ্চি দীর্ঘ, আয়তাকৃতির মসৃণ ও দেখতে গাঢ় সবুজ। এর পাতার পিঠের রঙ ঈষৎ ম্লান। এর পত্রবিন্যাস বিপ্রতীপ। মঞ্জরী অনিয়ত, শাখায়িত, বহুপৌষ্পিক ও প্রান্তিক। জারুলের ফুলের বেগুনি বর্ণ যেমন আকর্ষণীয় তেমনি শোভন-সুন্দর তার পাঁপড়ির নমনীয় কোমলতা। ছয়টি মুক্ত পাঁপড়িতে গঠিত এর ফুল। যদিও এর রং বেগুনি, তবুও অনেক সময় এর রং সাদার কাছাকাছি এসে পৌঁছায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম লেজারস্ট্রমিয়া স্পেসিওজা। নামটির প্রথমাংশ এসেছে সুইডেনের অন্যতম তরু অনুরাগী লেজারস্ট্রমের নাম থেকে। স্পেসিওজা ল্যাটিন শব্দ, অর্থ সুন্দর। জারুলের আদি নিবাস চীন, মালয়বাংলাভারতের জলাভূমি অঞ্চল।

জারুল ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব বৃক্ষ। বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও চীন, মালয়েসিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে জারুলের সন্ধান মেলে। নিম্নাঞ্চলের জলাভূমিতে এটি ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে, তবে শুকনো এলাকাতেও এদের মানিয়ে নিতে সমস্যা হয় না। মাঝারি আকৃতির এই বৃক্ষটি শাখা-প্রশাখাময়। এর লম্বাটে পাতাগুলো পত্রদন্ডের বিপরীতে সাজানো থাকে। এই পাতাঝরা বৃক্ষ শীতকালে পত্রশূণ্য অবস্থায় থাকে। বসন্তে নতুন গাঢ় সবুজ পাতা গজায়। গ্রীষ্মে ফোটে অসম্ভব সুন্দর বেগুনি রঙের থোকা থোকা ফুল। জারুল ফুলগুলো থাকে শাখার ডগায়, পাতার ওপরের স্তরে। প্রতিটি ফুলের থাকে ছ’টি করে পাঁপড়ি, মাঝখানে পুংকেশরের সাথে যুক্ত হলুদ পরাগকোষ। গ্রীষ্মের শুরুতেই এর ফুল ফোটে এবং শরত পর্যন্ত তা দেখা যায়।প্রথম আলোর নিবন্ধ [১] জারুল কাঠ লালচে রঙের, অত্যন্ত শক্ত ও মূল্যবান। ঘরের কড়ি-বরগা, লাঙল, আসবাবপত্র ইত্যাদি বহুবিধ কাজে জারুল কাঠ সুব্যবহৃত। জারুলের ভেষজ গুণও রয়েছে – জ্বর, অনিদ্রা, কাশি ও অজীর্ণতায় জারুল উপকারী। জারুলের Lagerstroemia indica নামে ছোট একটি জাত রয়েছে, যা বৃহত্ত্তর সিলেটকিশোরগঞ্জেপ্রচুর পরিমাণে দেখা যায়।

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় জারুলের সরব উপস্থিতি লক্ষনীয়। তিনি লিখেছেন:

এই পৃথিবীর এক স্থান আছে – সবচেয়ে সুন্দর করুণ
সেখানে সবুজ ডাঙ্গা ভরে আছে মধুকুপী ঘাসে অবিরল,
সেখানে গাছের নাম: কাঁঠাল, অশ্বত্থ, বট, জারুল, হিজল।

আকন্দ

আকন্দ

আকন্দ এক প্রকার ঔষধি গাছ। এর বৈজ্ঞানিক নামঃ Calotropis gigantea, C. procera। গাছটির বিষাক্ত অংশ হলো পাতা ও গাছের কষ। কষ ভীষণ রেচক, গর্ভপাতক, শিশু হন্তারক, পাতা মানুষ হন্তারক বিষ।

আকন্দ এক প্রকার গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এই গাছ সাধারণত: ৩-৪ মিটার পর্যন্ত উচুঁ হয়ে থাকে। আকন্দ দুই ধরণের গাছ শ্বেত আকন্দ ও লাল আকন্দ। শ্বেত আকন্দের ফুলের রং সাদা ও লাল আকন্দের ফুলের রং বেগুনি রং এর হয়ে থাকে। গাছের পাতা ছিড়লে কিংবা কান্ড ভাঙ্গলে দুধের মত কষ (তরুক্ষীর) বের হয়। ফলসবুজ,অগ্রভাগ দেখতে পাখির ঠোটের মত। বীজ লোম যুক্ত,বীজের বর্ণ ধুসর কিংবা কালচে হয়ে থাকে।

এই উদ্ভিদ বাংলাদেশের সর্বত্র পাওয়া যায়। রাস্তা পাশে এবং পরিত্যক্ত স্থানে বেশি পাওয়া যায়। আকন্দের পাতায় এনজাইম সমৃদ্ধ তরুক্ষীর বিদ্যমান। এতে আছে বিভিন্ন গ্লাকোসাইড,বিটা-এমাইরিন ও স্টিগমাস্টেরল আছে।

আকন্দ বায়ুনাশক, উদ্দিপক, পাচক, পাকস্থলীর ব্যাথা নিবারক, বিষনাশক, ফোলা নিবারক। প্লীহা, দাদ, শোথ, অর্শ, ক্রিমি ও শ্বাসকষ্টে উপকারী।

সোনাইল, বানরলাঠি

সোনাইল পূর্ব ভারতের নিজস্ব প্রজাতির উদ্ভিদ। গাছ ২০-৩০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। ছাল পুরু, মসৃণ। পাতা অনেকটা জামপাতার মতো, তবে ডগার দিকে সরু। ফাল্গুনের শুরু থেকেই পাতা ঝরতে থাকে। চৈত্রে পত্রহীন গাছকে মনে হয় শুকনো কাঠ। তারপর সেই শ্রীহীন শাখাগুলো যখন গ্রীষ্মের শুরু থেকেই ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়, তখন সোনাইলের সেই সৌন্দর্যের তুলনা নেই। পাপড়ি পাঁচটি। পুংকেশর ১০টি। ভেতরে সবুজ রঙের তিনটি গর্ভকেশর। এগুলো কাস্তের মতো বাঁকা। কানের দুলের মতো দেখায়। শাখা থেকে ফুলে ফুলে ভরা লম্বা মঞ্জরিগুলো নিচের দিকে ঝুলে পড়ে। দুলতে থাকে হাওয়ায় হাওয়ায়।
উদ্ভিদবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা তাঁর শ্যামলী নিসর্গতে বলেছেন, নামটি এসেছে গ্রিক ভাষা থেকে। ফিস্টুলা শব্দের অর্থ বাঁশি। সোনাইলের বাঁশির মতো লম্বা ফলের জন্যই এই নাম। তবে আমাদের দেশে এই ফলের জন্য লোকমুখে সোনাইল বা সোনালুর নাম হয়েছে ‘বানরলাঠি’। ফলগুলো এক থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। ব্যাস দেড় থেকে দুই ইঞ্চি। ফুল ঝরে গেলে সবুজ পাতার মধ্যে এই ফলগুলো লাঠির মতোই ঝুলতে থাকে। কাঁচা ফল সবুজ, পাকলে রং হয় কালচে লাল। বানরলাঠি নাম হওয়ার আরও একটি কারণ, এই ফল এবং গাছের পাতা বানরের প্রিয় খাদ্য।
ঢাকা সোনাইলের দেখা মেলে। ওসমানী মিলনায়তনের সামনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের কার্জন হলের সামনে, সংসদ ভবনের পূর্বপাশে সোনাইলের বেশ কিছু গাছের সারি আছে। গাছ খুব বড় নয় বলে বাড়ির উঠানের কোণে বা বাগানে লাগানোর উপযোগী।
প্রাচীনকাল থেকেই সোনাইলের ছাল, পাতা ও ফলের মজ্জা চিকিৎসায় ব্যবহূত হয়ে আসছে। ডিপথেরিয়া, গণ্ডমালা, কুষ্ঠরোগের ক্ষত, উপদংশ চিকিৎসায় কার্যকর। ফলের মজ্জা কোষ্ঠকাঠিন্য, হজমের সমস্যায় উপকারী। আমাদের নিজস্ব এই গাছ একটা সময় প্রচুর ছিল সারা দেশে, এখন প্রায় বিপন্ন তার অস্তিত্ব।

কদম

কদম দীর্ঘাকৃতি, বহুশাখাবিশিষ্ট বিশাল বৃক্ষ বিশেষ। রূপসী তরুর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কদম। কদমের কাণ্ড সরল, উন্নত, ধূসর থেকে প্রায় কালো এবং বহু ফাটলে রুক্ষ, কর্কশ। শাখা অজস্র এবং ভূমির সমান্তরালে প্রসারিত। পাতা হয় বড় বড়, ডিম্বাকৃতি, উজ্বল-সবুজ, তেল-চকচকে এবং বিন্যাসে বিপ্রতীপ। উপপত্রিকা অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী বিধায় পরিণত পাতা অনুপপত্রিক। বোঁটা খুবই ছোট। নিবিড় পত্রবিন্যাসের জন্য কদম ছায়াঘন। শীতে কদমের পাতা ঝরে এবং বসন্তে কচি পাতা গজায়। সাধারণত পরিণত পাতা অপেক্ষা কচি অনেকটা বড়। কদমের কচি পাতার রঙ হালকা সবুজ। কদমের একটি পূর্ণ মঞ্জরিকে সাধারণত একটি ফুল বলেই মনে হয়। তাতে বলের মতো গোল, মাংসল পুষ্পাধারে অজস্র সরু সরু ফুলের বিকীর্ণ বিন্যাস। পূর্ণ প্রস্ফুটিত মঞ্জরির রঙ সাদা-হলুদে মেশানো হলেও হলুদ-সাদার আধিক্যে প্রচ্ছন্ন। প্রতিটি ফুল খুবই ছোট, বৃতি সাদা, দল হলুদ, পরাগচক্র সাদা এবং বহির্মুখীন, গর্ভদণ্ড দীর্ঘ। ফল মাংসল, টক এবং বাদুড় ও কাঠবিড়ালির প্রিয় খাদ্য। ওরাই বীজ ছড়ানোর বাহন। গাছের বৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত বলে জ্বালানিকাঠের জন্য রোপণ উত্তম। কাঠ খুবই নরম তাই দারুমুল্য নিকৃষ্ট হলেও সাদা, নরম কাঠ বাক্স-পেটরা ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার্য। ছাল জ্বরের ঔষধ হিসেবেও উপকারী।
Rubiaceae পরিবারের এই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Anthocephalus chinensis

রঙ্গন

বাংলাদেশের সর্বত্রই দেখা যায় রঙ্গন ফুল। শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবে রঙ্গন অতি জনপ্রিয়। আকর্ষণীয় রূপ ও বর্ণের বৈচিত্র্যে রঙ্গন ঐশ্বর্যমণ্ডিত। তরুরাজ্যে প্রায় সারাবছরই সবুজ পাতার ফাঁকে রঙ্গনের প্রস্ফুটন মানুষ প্রাণভরে উপভোগ করে। ঘন চিরসবুজ গুল্ম জাতীয় রঙ্গন উদ্ভিদ তিন থেকে ছয় মিটার পর্যনত্ম উঁচু হয়। মঞ্জুরিপত্র বিশিষ্ট গাঢ় লালবর্ণের পুষ্প-মঞ্জুরিতে থাকে অসংখ্য পুষ্পের সমাবেশ। পর্যায়ক্রমে থোকা থোকা লাল কমলা ফুলের প্রস্ফুটনের প্রাচুর্যে ও সমারোহে এক অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে রঙ্গন। পাতার ঘন বিন্যাস অপূর্ব। পাতা সরল ও প্রতিমুখ বা আবর্ত, কিনারা অখ-, উপপত্র দুটি বৃনত্মের মাঝে অবস্থিত। ফুল নলাকৃতি, তারার মতো চারটি পাপড়ির বিন্যাস সত্যিই মনোমুগ্ধকর। রম্নবিয়েসিগোত্রভুক্ত রঙ্গন শুধু লাল বর্ণেরই হয় না গোলাপি, হলুদ, কমলা ও সাদা বর্ণেরও হয়

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here